ঘুরে ফিরে একটাই প্রশ্ন আসছে : হিন্দু নারীদের সম্পত্তিতে অধিকার দিলে তাদের ধর্মান্তরিত করে সম্পত্তি দখলে নেওয়ার ঝুঁকি বাড়বে কি-না?

  

www.riaantv.com

প্রথম কথা হল, বর্তমানে বাংলাদেশের হিন্দুদের হাতে যতটুকু সম্পত্তি আছে তার পুরোটাই পুরুষদের হাতে আছে। এরফলে পুরুষদের ধর্মান্তরীত হওয়ার প্রবণতা কতটুকু? সম্ভবত, নারীদের তুলনায় কম। তবুও যত ”নও মুসলিম” ইসলামী বক্তা দেখা যায় তাদের সবাই তো পুরুষ! অর্থাৎ পুরুষরাও ধর্মান্তরীত হয়। এই অজুহাতে কি বাংলাদেশের সকল হিন্দু পুরুষের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার পাওয়া বন্ধ করে দেওয়া যায়? কোনো একজন পুরুষ মুসলমান হয়েছে, সেই অজুহাতে হিন্দু পুরুষদের সম্পত্তি দেওয়া যাবে না – এই যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য? তাহলে নারীদের বেলায় আপনারা এরকম অমানবিক যুক্তি কিভাবে দেখান? 

দ্বিতীয়ত: পুরুষের হাতে বর্তমানে সকল সম্পদ আছে। কিন্তু তারা সেই সম্পদ রক্ষা করতে পারছে না কেন? পুরুষের এই অযোগ্যতার জন্য কি তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায়? এখন পর্যন্ত হিন্দুদের যত সম্পদ বেহাত হয়ে গেছে সেগুলো পুরুষদের হাত দিয়ে হয়েছে, না নারীদের হাত দিয়ে হয়েছে? নিশ্চয় পুরুষদের হাত দিয়ে। তাহলে নারীকে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করছেন, পুরুষদের নয় কেন? 

তৃতীয়ত: গত ৫০ বছর যাবত যারা সম্পত্তি মুসলমানদের হাতে তুলে দিয়ে ক্রমাগত দেশান্তরী হচ্ছেন, তারা নারী না পুরুষ? সেটা ভারত হোক আর আমেরিকা হোক, বিদেশে বসতি গড়ার ৪/৫ বছর পর রাতের আঁধারে একদিন দেশে ফিরে কিছু টাকার বিনিময়ে গোপনে সম্পত্তি আরেকজনকে (মুসলমান বা অমুসলমানকে) লিখে দিয়ে আবার পরের রাতে চম্পট দেওয়ার যত ঘটনা আছে, সেগুলো নারীরা ঘটাচ্ছে, না পুরুষরা? তাহলেতো পুরুষদের হাতে কোনো সম্পদ দেওয়া উচিত নয়! কি বলেন? নারীর অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনারা এধরণের মানবাধিকারবিরোধী যুক্তি দেন কিভাবে? সেই একই যুক্তি পুরুষের ক্ষেত্রে নয় কেন?

চতুর্থত: নারীর হাতে বর্তমানে সম্পত্তি নেই। তাতে নারীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলা, বলপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া- তাকে লাভ জেহাদ বলুন আর যাই বলুন- নানা উপায়ে ধর্মান্তরীতকরণ কি বন্ধ আছে, না চালু আছে? 

পঞ্চমত: নারীরা অবলা না থেকে সবলা হলে তাদেরকে প্রলুব্ধ করা বা তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্মান্তরীত করা কমবে না বাড়বে? আপনার কমন সেন্স কি বলে? নারীকে শিক্ষাহীন, সম্পদহীন করে রাখলে সে অসহায় ও দুর্বল থাকে, নাকি বেশি সবল থাকে? সেই দুর্বলকে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব আপনারা পুরুষরা পকেটে করে নিয়ে বেড়াবেন? নারীদের সবল হতে দেবেন না?

ষষ্ঠত: নারীর আত্মোন্নতি ঘটলে বাংলাদেশের হিন্দুপরিবারগুলো এবং সামগ্রিকভাবে হিন্দু সমাজ উপকৃত হবে, নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হবে? আপনার সম্প্রদায়ের অর্ধেক মানুষকে আপনি যখন দুর্বল ও আশ্রিত করে রেখেছেন, তখন তারা আপনার সম্প্রদায়ের জন্য বোঝা, না-কি শক্তি? এই নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন পুরোপুরি ঘটানো গেলে আপনার সম্প্রদায়ের শক্তি বাড়বে না কমবে? 

সপ্তমত: একবার বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, বাংলাদেশের হিন্দু পুরুষরা আসলেই কাপুরুষের প্রতিভূ কিনা? গত পঞ্চাশ বছর ধরে এই হিন্দুরা দেশে বীরত্বের নজির দেখিয়ে আসছে – না-কি “পলাবো না তো ভয় করব?” --নীতির উপর চলছে? তাহলে এই পুরুষদের সম্পত্তির দখলদার বা নিজেদেরকে শক্তির আধার ভেবে বড়াই করার কোনো অবকাশ আছে? হিন্দুদের পরিবারে, সমাজে এবং রাষ্ট্রে পুরুষ নেতৃত্বের বাড়তি কি অর্জন আছে? তাহলে এই পুরুষ কর্তৃত্বের প্রবণতা পরিহার করে নারীদের সমভাবে এগিয়ে নেওয়ার শুভচেষ্টাকে আপনারা বাধা দেন কেন? 

অষ্টমত: আপনারা মিথ্যা প্রচারণায় বিভ্রান্ত হন কেন? বাংলাদেশের বিদ্যমান হিন্দু আইন এবং রাষ্ট্রীয় আইন- উভয় আইনেই একজন ব্যক্তি ধর্মান্তরীত হলে উত্তরাধিকারের সুযোগ হারায়। এই আইন বিদ্যমান আছে। নারীদের সম্পত্তির অধিকার দেওয়া হলে ধর্মান্তরের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার হারানোর বিধানটি তুলে দেওয়া হবে- এমন কথা কি কেউ বলেছে? 

নবমত: সনাতন ধর্ম অনুযায়ী আপনি নারীকে শক্তিরূপে উপাসনা করেন কি করেন না? নারীকে সৃষ্টি, স্থিতি এবং বিনাশের শক্তি হিসেবে -”সৃষ্টিস্থিতিবিনাশানাং শক্তিভূতে সনাতনি-”ইত্যাদি মন্ত্রে প্রণাম করেন কিনা? তাহলে সেই নারীকে দুর্বল ভাবা অথবা দুর্বল করে রাখা আপনার ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিকুল কিনা? সকল পুরাণ বলছে, দেবশক্তি যখন বিপদে পরে তখন নারী শক্তিই আশ্রয় দাত্রী। ভগবান দূর্গা রূপে, রক্ষাকালী রুপে সবাইকে রক্ষা করেন। সর্ব শক্তির আধার সেই দেবি কি ধর্ম অনুযায়ী দুরবর্তী কল্পনার দেবী? চন্ডিতে পরিস্কার ভাষায় বলা হয়েছে, তিনি ”সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা।” পৃথিবীর সকল নারীই সেই শক্তি স্বরুপা। তাহলে আপনি কি সনাতন ধর্মে বিশ্বাস করেন না? তাহলে নারী শক্তিকে দুর্বল হিসেবে কল্পনা করেন কিভাবে? 

সেকারণেই আমি বলি --শুধু উপহাস করার জন্য নয়, বাস্তবতার নিরীখেই বারবার বলি --হিন্দু পুরুষরা বরং দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণ করুন। আপনাদের রক্ষার দায়িত্ব হিন্দু নারীদের উপর তুলে দিন। কারণ স্বাধীনতার গত অর্ধশতকে এবং তার আগেও প্রমাণ হয়েছে, বাংলার হিন্দু পুরুষরা ভীতু ও দুর্বল। এরা কোনও কিছুই রক্ষা করার সামর্থ্য রাখেনা। এরা নিজে বাঁচার জন্য অপরকে হায়েনার হাতে তুলে দেয়। এবার সকল অকর্মণ্য মিলিতভাবে নারীর হাতে সহায় সম্পদসহ সবকিছু তুলে দিন। নারীরা আপনাদের রক্ষা করতে পারবে। হিন্দু নারীর ক্ষমতায়ন দরকার; তাদেরকে শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, অর্থে এবং সম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে দিন। নারীকে আত্মপ্রত্যয়ী হতে দিন। তারাই আপনাদের রক্ষা করবে। অকর্মন্য কাপুরুষের দল বাগারাম্বর না করে আত্মসমর্পণ করুন এবং ”জয় মা” বলে নারীর পদানত হন। নারীকে রক্ষা করতে হবে না, নারীরাই আপনাদের রক্ষা করবে। 


হিন্দু নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য পুরাতন আইনগুলো সংশোধন হওয়া উচিত। সব আইনের সংশোধন দরকার। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল পারিবারিক আইন একদম ঢেলে সাজানো দরকার। অভিন্ন সিভিল কোড হওয়া দরকার। আধুনিক উন্নতবিশ্বের আদলে নারীদের পূর্ণাঙ্গ অধিকার ও ক্ষমতা দিয়ে আইনগুলো যুগোপযোগী করা দরকার। তাতে দেশ এগোবে। কিন্তু মুসলিম মোল্লাতন্ত্র যদি তাতে রাজি না হয়- তারা যদি দেড় হাজার বছর পেছনে পড়ে থাকাকেই ভাল মনে করে, সেজন্য হিন্দুরা কেন নিজ সম্প্রদায়কে এগিয়ে নেবে না? তাছাড়া মুসলমান সম্প্রদায়ের নারীরা পুরুষের অর্ধেক হলেও সম্পত্তিতে অধিকার পায়। কিন্তু হিন্দু ও বৌদ্ধ নারীরা যে একদম অসহায়; অধিকারহীনা! তাই হিন্দু আইন অবিলম্বে সংশোধন দরকার। হিন্দু আইনের সবগুলোই সংশোধন দরকার- তবে সবার আগে দরকার উত্তরাধিকার আইন সংশোধন করা। এই একটি আইন সংশোধন করে নারীকে সমঅধিকার দেয়া হলে হিন্দু নারীদের ব্যাপক অগ্রগতি হবে। নারীর পারিবারিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ঘটবে। এতে হিন্দু সমাজও সমৃদ্ধ এবং শক্তিশালী হবে। নারীর উপর অবিচার কমবে এবং নারী অপহরণ বা নারীদখলের সামর্থ্য কমে যাবে। কারণ ক্ষমতাধর আত্মমর্যাদাশীল নারীকে বোকা বানানো কঠিন হবে। দয়া করে নারীদের আর ’অবলা’ করে রাখবেন না।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন