দুই হাজার সালের আগের এবং উনিশশ নব্বই সালের পরের কথা বলছি.....

পাটকে যখন সোনালী আঁশ বলা হতো, বাংলাদেশ ছিলো তখন কৃষি নির্ভর দেশ।

এখনের মতো তখন এতো কর্মসংস্থানের ব্যবস্হা না থাকার কারনে সমাজের প্রায় পরিবারেরই ছোটো ভাই/ বড় ভাই- সব ভাই মিলেই প্রায় বেকার ছিলো। ভালো একটা  শার্ট বা গেঞ্জি বড় ভাইয়ের থাকলে, বড় ভাই/ ছোটো ভাই- মিলেই পড়তো... আগে যাবার, বড় হবার, উপরে উঠবার কোনো প্রতিযোগীতা ছিলো না। ছিলো না দেশ ছেড়ে বিদেশ যাওয়ারও এতো প্রতিযোগীতা।

সারা দেশের প্রতিটি গ্রামের প্রায় প্রতিটি সমাজেই ছিলো সহজ- সরল, ভালো মানুষদের বসবাস। সুখ- দুঃখ, বিপদাপদ তখন সমাজের বড় ছোটোর মাঝে ভাগাভাগি হতো।

ভাঙ্গাচোরা জোড়াতালির ঘর ছিলো সমাজের অধিকাংশ মানুষেরই তবে সমাজ ছিলো গোছানো। অভাব-অনটন থাকলেও মানসিক শান্তি ছিলো মানুষের মনে, অশান্তি ছিলো না সমাজ- সংসারে। সর্দাররা তখন সর্দারী করতো... অনেক সুন্দর গোছিয়ে রাখতো সমাজ... বড়- ছোটোর মাঝে সুন্দর মান্যগন্য ছিলো। যোগ্য অযোগ্যরা মিলে তখন এলোপাতাড়ি মাতব্বরি করতো না।

এখনের মতো তখন মানুষ এতো লন্ডন, আমেরিকা আর ইসরাঈল, ফিলিস্তিন চিনতো না, জানতো না। জীবনযাপন ছিলো বড় সাদামাটা, এতো কিছু বুঝতো না, খুঁজতো না, চিনতো না, জানতো না। মানুষগুলো তখন নিজেকে, নিজেদেরকেই চিনতো জানতো বুঝতো।

হিংসা, প্রতিহিংসার এতো কাড়াকাড়ি, বাড়াবাড়ি ছিলো না। মানুষগুলো জানতো না এতো বেশি ছয়নয় বক্কর চক্কর। কথা কাজের মিল ছিলো, জবানের ঠিক ছিলো। সঠিক নীতি আদর্শ ছিলো মানুষের মাঝে। মানুষ ঠকানোর এতো কায়দা কৌশল জানতো না মানুষ।

এখনের মতো তখন এতো ছদ্মবেশী ভন্ড বাটপার ছিলো না।

মানুষের প্রতি ছিলো মানুষের যথেষ্ট আন্তরিকতা মায়া মহব্বত ভালোবাসা।

এখন মানুষ মানুষের বিপদ দেখলে খুশি হয়, মজা পাই... সুখ দেখলে মারাত্মক হিংসায় জ্বলে।

সহজ সুবিধার এতো শিক্ষাদীক্ষাও ছিলোনা তখন, ছিলোনা তাই এতো উন্নত সমাজ ব্যবস্হাও। জীবন জিন্দেগী বলতে খেয়েদেয়ে কোনো ভাবে বেঁচে থাকতে পারলেই হইলো। আশা আখাংকার মাত্রা ছিলো কম………

প্রযুক্তির প্রভাব ছিলো না এতো, অভাব ছিলো সহজ সুবিধার যোগাযোগ ব্যবস্হার।

ভালো লাগা আর মন্দ লাগার আবেগ অনুভূতিগুলো প্রকাশ হতো তখন হাতে লিখা চিঠি আদান-প্রদানের মাধ্যমে..... 

সামাজিক যোগাযোগের জন্য দেশের পোষ্ট অফিসগুলো ছিলো অনেক জনপ্রিয়...

আফসোস লাগে বহু আবেগের দেশের পোষ্ট অফিসগুলো এখন অচল প্রায় একেবারে....

বিনোদন ব্যবস্হার ছিলো একেবারে নগন্য অবস্হা- গ্রামের প্রভাবশালী ২/৩ টা বাড়িতে সাদাকালো আর রঙিন মিলিয়ে ২/৪ টা টেলিভিশন ছিলো..... সে বাড়িগুলোতে শুক্রবার দিন বাংলা ছবি আর রাতে আলিফ-লায়লা দেখার জন্য প্রচুর লোকের ভীড় জমতো, টিভি'র মালিকদের বাড়ির আঙিনা কানায় কানায় পূর্ণ হতো লোকে....  এতো লোকের এতো বেশি উৎপাত  দেখেও টিভি'র মালিকদের মনে কোনো রকমের কোনো রাগ বিরক্ত জাগতো না......

ওই সময় টেপরেকর্ডার এর প্রতিও অন্যরকম একটা আবেগ ছিলো মানুষের, মন খোরাকের দারুণ একটি যন্ত্র ছিলো.... তখনকার সময় টেপরেকর্ডার এ ৫ মিনিটের একটা গান শুনলে যতটা না ভালো লাগতো, এখন উন্নত প্রযুক্তির এ সময় ৩ ঘন্টার ৫ টা ছবি দেখলেও এতোটা ভালো লাগে না।

গ্রামবাসীর মাঝে একতা ছিলো, মিল মহব্বত ছিলো যুব সমাজে.... প্রতি রাতেই গ্রামের বিশিষ্ট মুরুব্বীরা বিশিষ্ট ২/ ১ জন মাতব্বরের বাড়িতে এসে বসে বুঝ পরামর্শ করতো গ্রামকে কিভাবে সুন্দর করে পরিচালনা করা যায়।

বিকেল বেলা একই মাঠে খেলাধূলা জমতো... সারা গ্রামের ছেলেরা মিলেমিশেই খেলাধূলা করতো.. সবার চলাফেরাতেই ছিলো অনেক সুন্দর নিয়ম শৃঙ্খল।

সমাজে এখন বড় বড় ঘর হইছে.. মানুষে মানুষের পর হইছে। সকলেরই এখন উন্নত জীবনযাপন...  সব কিছুতেই পরিবর্তন। কেউরে কেউ মানেনা, গুনেনা। বাহাদুরি আর অহংকারে মানুষের ভিতর ভরা।

সবারই এখন আলাদা আলাদা চলা, কারো দুঃখের কথাই যেনো করো সাথে যাচ্ছে না বলা।

আমরা দরিদ্রতা হারিয়ে স্বচ্ছলতা পাইছি। আমরা এতো কিছু পেয়েও আমরা কাঙ্গাল এখনও সুখ কাঙ্গালই আছি।

সহজ সরল ভালো মানুষদের সমাজ এখন নষ্টরা চালায়… ভয় ডর আতঙ্ক পিছু ছাড়ে না তাই সাধারন মানুষের… হালাল হারাম মিশ্রিত টাকায় যা মন চাই তা করতে আশ্রয় প্রশ্রয় পাচ্ছে সমাজের অসৎ ইতররা।

রীতি নেই, নেই নিয়ম নীতি সমাজে। সমাজের আমরা কেউ ভালো নেই কোথাও....

অতীত দিনের সাদাকালো দৃশ্যগুলো যখন চোখে ভাসে...মনের ঘরে তখন অনেক বেশি ব্যথা জাগে... খুব বেশি আহত হয়...

উন্নত সমাজ ব্যবস্তার এমন মহা ঝামেলার দিনে...

অনেক মিস করি গ্রামের ভালো মানুষগুলোকে যারা রাস্তাঘাটে মাথার চুলগুলো এলোমেলো দেখলে জিজ্ঞেস করতো ভাতিজা তোমার কি শইল খারাপ?

আগের মতো মানুষ নাই, আগের মতো শান্তিও নাই।

সমাজের উন্নতি হচ্ছে হোক...

মনেপ্রাণে চাই শান্তি সুখের এমন সুন্দর একটা সময় আমাদের মাঝে আবার ফিরে আসুক।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন