তালেবানী ইসলামের ভয়ে পলায়ন: এটা কি ইসলাম?

ধর্মীয় অনুভূতির চেয়ে স্পর্শকাতর কোনো কিছু আর নেই। ধর্মীয় অনুভূতি যদি ভুল পথে প্রবাহিত হয় তাহলে আল কায়েদা, তালেবান, আইএস-এর মতো ধ্বংসাত্মক সংগঠনগুলোর যাবতীয় কাজকেও ন্যায়সঙ্গত বলে, অনুসরণীয় বলে মনে হতে পারে। 

এমতাবস্থায় মানুষ ইহজগতের সকল সুখ-সম্ভোগকে তুচ্ছ করে নিজেদের জীবন ও সম্পদকে কথিত জিহাদের জন্য কোরবানি করাকেই সফলতার পন্থা বলে ধরে নিতে পারে, এবং নিচ্ছে। তারা এটা বুঝতে অক্ষম যে, তারা যেটাকে ইসলাম বলে বিশ্বাস করছে এবং জোর করে যে ব্যবস্থাটাকে মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করছে সেটা আদৌ আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনীত ইসলাম নয়। প্রকৃত ইসলাম কখনওই ইসলামভীতি বা Islamophobia সৃষ্টি করেনি। 

আজ যখন তালেবানরা কাবুল দখল করে নিল, তারা যদি সত্যিকারের ইসলামের ধারক হতো তাহলে কাবুলের জনগণ তাদেরকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিত। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটল তার এর সম্পূর্ণ বিপরীত। কাবুলের জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল, বিশেষ করে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল নারীরা। বোরকা দাম বেড়ে গেল তিনগুণ। 

হাজার হাজার মানুষ কাবুল ত্যাগ করার জন্য মরিয়া হয়ে গেল, ঠিক যেভাবে বৈদেশিক আগ্রাসনের শিকার হলে মানুষ জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। বাসে ট্রেনে ওঠার জন্য যেভাবে কুস্তি করে সেভাবে বিমানগুলোতে উঠে কাবুল ত্যাগ করার জন্য মানুষ কুস্তি করছে। সেখানে মার্কিন সেনাবাহিনীর গুলিতে পাঁচজনের প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটেছে, যারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য গুলি করতে বাধ্য হয়েছিল।

না, এটা ইসলামভীতি নয়। যারা তালেবানী শাসন থেকে জীবন নিয়ে পালাতে চাচ্ছেন তারা ভালো করেই জানেন যে, তালেবানের শাসন মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ। মৃত্যু সহজ, কিন্তু এই জুলুম ও বর্বরতার মাঝে বেঁচে থাকা কঠিন। আর এটা কেবল তাদের বিশ্বাস নয়, এটা তাদের অভিজ্ঞতা। নারীরাই ইসলামের নামে এই চরমপন্থার সবচেয়ে বড় লক্ষ্যে পরিণত হবে।

ইতোমধ্যেই আফগান নারীরা নিকটাত্মীয় পুরুষসঙ্গী ছাড়া বের হতে পারছেন না। যে কারো বাড়িঘর তালেবানরা পছন্দ হলেই জোর করে দখল করে নিচ্ছে এবং বাসিন্দাদের বের করে দিচ্ছে। বহু হাসপাতাল তারা দখল করে নিয়েছে যেখানে জরুরি অবস্থার রোগীদেরকেও ভর্তি করতে দেওয়া হচ্ছে না। যে সব পরিবারে কুমারী মেয়ে আছে তারা ভয় পাচ্ছে যে কখন তালেবানরা এসে কুমারী মেয়েদেরকে দাবি করে। কারণ ইতোপূর্বে ঐ দেশে এমনটা হয়েছে। তালেবানরা জনগণকে জানিয়ে দিয়েছে যে, এখন থেকে ১২ বছরের বেশি বয়সের কোনো মেয়ে স্কুলে যেতে পারবে না।

মার্কিনীরা বিগত দুই দশকে আফগানিস্তান থেকে যা নেওয়ার ছিল নিংড়িয়ে নিয়ে গেছে। এখন ইউরোপ-আমেরিকার কোনো দেশই আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষের পাশে নেই। [সূত্র: ৯ নারীর বর্ণনায় আফগানিস্তানের বর্তমান অবস্থা- প্রথম আলো, ১৬ আগস্ট ২০২১]

কিন্তু আল্লাহর রসুল ও তাঁর সাহাবিরা যখন কোনো একটি দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছেন দেখা গেছে সেই এলাকার জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁদেরকে সহযোগিতা করেছে। বেসামরিক ব্যক্তিকে আঘাত করা আল্লাহর হুকুম পরিপন্থী। ইসলামের অনুসারীদের ভদ্রতা, চরিত্র, নৈতিকতা বিজিত ভূখণ্ডের মানুষকে তাদের বিষয়ে নির্ভয় করেছে, আস্থাশীল করেছে। কিছুদিন যেতেই তারা ইসলামের সুমহান আদর্শকে আপন করে নিয়েছে। যুদ্ধ করে রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণ করলেও ব্যক্তিজীবনের উপর কোনো প্রকার জবরদস্তি ইসলাম আরোপ করে নি। 

ইসলামের সেই প্রকৃত রূপ আজ নেই। যদি ইসলামের সঠিক আদর্শ বা আকিদা মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হয় তাহলে আসল ইসলাম আর নকল ইসলামের পার্থক্যটা মানুষ সহজেই করে নিতে পারবে। 

জঙ্গিবাদীদের উপর কেবল শক্তিপ্রয়োগের নীতি কখনোই ধর্মীয় অনুভূতির এই উত্তাল তরঙ্গকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না। আফগানিস্তানে ২০ বছর লড়াই করেও জঙ্গিবাদ নির্মূল হয় নি, বরং বহুগুণ বেশি শক্তি ও সামর্থ্য অর্জন করেছে। আমাদের দেশেও সন্ত্রাসবাদীদের কেবল গ্রেফতার করে, ফাঁসি দিয়ে জঙ্গিবাদকে নির্মূল করা যাবে না। এর পাশাপাশি প্রয়োজন মানুষের সামনে জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর আকিদাগত, ধারণাগত ত্রুটিগুলো তুলে ধরা, ইসলামের জেহাদ ও কেতালের সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরে মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে সঠিক খাতে পরিচালনা করা। 

মানুষ যখন সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, পথ ও পথভ্রষ্টতার তফাৎ নিজেদের বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে বুঝতে সক্ষম হবে, তখন তাদের ঈমানকে আর কেউ হাইজ্যাক করে জঙ্গিবাদের দিকে নিয়ে যেতে পারবে না। তারা প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদীর শিক্ষা ও চেতনায় দীক্ষিত হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন